ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী : ৪র্থ পর্ব

ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী : ৪র্থ পর্ব

ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ
ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

 

Table of Contents

ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী : ৪র্থ পর্ব

৯১। রসের কথা অরসিকে বলো না।।

রসের কথা অরসিকে বলো না।। কয়লাকে ডুবালে, দুগ্ধের বরণ না।। মহারাজা বাঞ্ছা করলে, তিন করবে শত চিনি নিম্ন রোপণা, তাহে তিন গুণ তিত হল।। মিঠাগুণ হলনা।। যমন কাকা তোতা খঁাঁচাতে, যত্ন পোষ মানাতে, ধরাইব খেতে দেয় মাখন ছানা, তোতা বুলি নিবে, কাকের বুলি হবে দরিদ্র এক জংলা হতে, দাঁড়ায়ে বাদশার দ্বারেতে, বাদশা তারে করে, খেতে ডাব চিনি পানা, কামড়ে খেয়ে ভাঙ্গে, চুলে খেতে জানে না।। নগরে বিষম নদী, ডুবলি না নিরবধি, হিরুচাদের বাক্য ভুলে মন টোপা পানা, পাণ্ডু বলে ডুবে দেখ মন, পাবি লাল দানা।

৯২। যার জ্ঞান আছে, সে পদে নিহার দিয়ে রয়েছে।

যার জ্ঞান আছে, সে পদে নিহার দিয়ে রয়েছে। সর্বস্বধন গুরুপদে সমর্পণ করেছে।। অনুরাগের বাতি জ্বেলে, নয়নে রেখেছে, তীর্থ ত্যাজ্য করে স্বরূপ নিষ্ঠা করেছে, গরল খেয়ে সরল হয়ে, জেন্দা মরেছে।। অধর চাঁদের ভাবে, রতি শান্ত করেছে, ছয় রিপু কাজে দিয়ে, প্রেমের রসিক হয়েছে, রসামৃত পান করে, শমন ফাঁকি দিয়াছে।। শুরু সুখের সুখী হয়ে, সেবাদাসী হয়েছে, অন্ধকারে বাতি জ্বেলে, নিত্যধামে গিয়াছে, পাণ্ডু বলে মায়া জালে, আমার ঘিরে রেখেছে।

৯৩। দয়াল গুরু বিনে, পারের উপায় তোমার রে, ঘোর তুফানে।।

দিনে দিনে দিন ফুরাল, মৃত্যুকাল আছে সামনে রে, ভাবনা মনে।। ভব নদীর তুফান দেখে মরবি হুতাশে, কেউ হবে না সঙ্গের সাথী, পারে যাবি কেমন করে রে, সে কঠিন দিনে।। ভব নদী বল যারে, কুলে যাওয়া ভার, চক্ষু হবে ঘোর অন্ধকার, সেদিন কে তরাবে আর রে, সেই নিদানে।। কেবা আমার কারবা আমি, কে আমার আছে, ভব পারে যাবি যেদিন, সকল হবে মিছেরে, দেখ না জেনে।। ভবে কর পারের সম্বল শুন আমার মন, গুরুতে সম্বন্ধ হলে, অধীন পাণ্ডু কেঁদে বলেরে, তরবি সেখানে।।

৯৪। দয়াল গুরু ভুলে, জনম মায়ার ভোলে পড়ে রে, গেল বিকলে।।

দয়াল গুরু ভুলে, জনম মায়ার ভোলে পড়ে রে, গেল বিকলে।। ভুল হলো মোর মূল সাধনে, কি বলে জবাব দিবিরে, নিকাশের কালে।। ভব নদী পারের বিধি, কি আমার আছে, ভজন শূন্য দেহ গুরু, ছোবে কোন গুণেরে, অস্তিম কালে।। গুরুর চরণ পারের সম্বল, ভব নদীতে, মন হলি তুই ভক্তিহীন, গুরুর চরণ মিলে কিসেরে, আমার কপারে।। ভুলে রলাম ভবের কূলে, কূল পাব কিসে, ভেবে দেখরে অবোধ মন তুই, হারা হলি দিশেরে, কূল গেল কূলে।। মন প্রাণ দিন থাকিতে সঁপ গুরুতে, এদিন গেলে সেদিন পাব, গুরু সখা হলেরে, পাণ্ডু তাই বলে।।

৯৫। গুরু রূপে নয়ন দেরে মন।।

গুরু রূপে নয়ন দেরে মন।। গুরু বিনে কেউ নাই তোর আপন।। গুরুরূপে অধর মানুষ দিবে তোরে দরশন।। পিতার ভাঙে কিরূপ ছিলি, মারের গর্ভে কিরূপ হলি মন, পূর্ব পরে নিরস্তরে, গুরুরূপে নিরঞ্জন।। রজবীজ মিলন কে করিল, কোথায় আছে তার আসন, ব্রহ্মাণ্ডের গড়ন গড়ে সে কোন জন।। কোথায় ছিলি কারবা সাথে ভবে আলি ওরে মন, অধীন পাণ্ডু বলে শুরু, ধরে কর তার অন্বেষণ।।

বাউল
বাউল

 

৯৬। ধরা যায়রে অধরে।।

ধরা যায়রে অধরে।। যদি নিষ্ঠা হয় স্বরূপ দ্বারে।। মূলাধার সেই অটল বৃক্ষ, আছে দুটি ফল ধরে।। লাল শ্বেত দুটি ফুল, পিতামাতা নাম ধরে, অর্টলের বরাতী মানুষ, গড়েছে ফল মৈথুন করে।। অটল মানুষ নিজরূপ, স্বরূপে সে রং ধরে, পিতামাতা পদ্ম ফুলে ভাসিছে সমুদ্দুরে।। মহাযোগ সমুদ্দুরে, অটল রূপ ঝলক মারে, পাণ্ডু বলে তীরধারে, ধর ভাটা জোয়ারে।।

৯৭। অধর চাঁদ মিলে।।

অধর চাঁদ মিলে।। মুরশিদ আঁধার ঘুচালে।। দেখবি লীলা চাঁদের খেলা, খেলা বিলে।। চাঁদের সিংহাসনে উদয়, তিল প্রমাণ জায়গা বুঝার, রংমহাল তার, পান্নাতন সে আসন, ঘিরে সকলে।। অমাবশ্যা সে চাঁদের নাই, দিবা নিশি হচ্ছে উদয়, দেখলে দেখা যায়, মানব জনম সফল হবে, সে চাঁদ দেখিলে।। দেখে শুনে সাধন করে সে জন যাবে ভব পারে, সে চরণ ধরে, পাণ্ডু বলে সাধের জনম গেল বিফলে।।

খোন্দকার পাণ্ডু শাহের পদাবলী ॥ ১৬৭ ৯৮। পাপের কারখানা।। গুরু বাক্য কেটে সাধু হবা মনে ভেবোনা।। শুরু সুখের সুখী হবা, অস্তিমে শ্রীচরণ পাবা মনরে, তাই বলে কুল নাশ করিলে, মদন জ্বালা গেল না।। রস না জেনে রসিক হলে, গুরু নিষ্ঠা না করিলে মনরে, মদ খাওয়া মাতালের মত, মাতলে চরণ পাবানা।। বাঞ্ছা ছিল ভজন করে, ভব সিন্ধু যাব তরে, মনরে পাণ্ডু ফকির রিপুর দোষে, হয়ে গেল দীন কানা।।

৯৯। লোভে মেতোনা।।

লোভে মেতোনা।। গোপীর ভজন সত্য জাজন, মিথ্যা বলা গেলনা।। গোপী চিনে সরল মনে, গুরু কেন ভজনা।। এলে যদি ভবের হাটে, হয়োনারে ভূতের মুটে, মনরে, এক দোকানে বিকিকিনি, সদায় কেন করনা।। রসের ধারা জেনে নিয়ে, ভিয়ান কর ময়রা হয়ে, মনরে, পাবারে সে প্রেম রতন, জঠর জ্বালা করবেনা।। যমন কানা বিড়াল দধি বলে, মরেছিল তুলো গিলে, মনরে, পাণ্ডু মল চিটে গুড়ে, ভুলেরে মিছরী দানা।।

১০০। আমার মন আপন দেহ চেন।।

আমার মন আপন দেহ চেন।। দেহের খবর না জানিয়ে, মিছে কোট কাছারী করছ কেন।। কুল দুনিয়ার খবর আছে, আঠারো মোকামের মাঝে কোন মোকামে সাঁই বিরাজে, হুশিয়ার হয়ে অর্থ জান।। লাহুত-নাছুত-মলকুত-জবরুত, কালের রুহু দেল দম ধর, চার মোকামে চারি ধর, লা-মোকামেস সাঁইর আসন।। হাহুত মোকামের ধারা জানলে যাবে অধর ধরা, তবে পাবি কূল কিনারা জেনে ভজ গুরু ধন।। আত্মতত্ত্ব পর তত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব জান সত্য, অধীন পাণ্ডু পায়না অর্থ, মিছে ফকির হলাম লোক জানান।।

বাটিক প্রিন্টিং এ বাউলচিত্র
বাটিক প্রিন্টিং এ বাউলচিত্র

১০১। গুরু বিনে মনের কথা বলব না।।

গুরু বিনে মনের কথা বলব না।। কারো বলবনা কিছু শুনবনা।। ব্যথার ব্যথীত বিনে অন্য জনে বললেও কিছু হবেনা।। শুন ওরে আমার মন, গুরু দিল পরম ধন, নিজে না করিয়ে যতন, করলি তারে বিতরণ, কেন বেনা বনে মুক্তা ফেলে, মন হলি তুই দিন কানা।। না করে ভজন সাধন, যারে তারে বলো না মন, পাষাণ দলন তোর কথায় মন হবে না, কারো ঠেশে ঠুশে ভজাইলে, কখনও সে ভজবে না।। যমন কাঠুরে এক মাণিক পেয়ে, বাজারেতে যায়গো ধেয়ে, দোকানেতে ফেলে দিয়ে, মূল্য নিতে জানেনা, তখন অবোধ কাঠুরের হাতে, মানিক কেহ দিওনা।। মন হয়েছে আলা ঝালা, ভজন সাধন করলে ঘোলা, হিব্রু চাঁদের চরণ দুটি ভুলোনা, অধীন পাণ্ডু বলে, মন রসনা, পরের মজায় মজো না।।

১০২। ও মনরে, গুরু বিনে কে তরাবে অপারে।।

ও মনরে, গুরু বিনে কে তরাবে অপারে।। যে দিন মনরায়, যাবেরে ফাঁকি মেরে।। কোন দিন ভোজের বাজী করে, সুখের পাখী যাবে উড়ে, আদরিণী ছেড়ে গেলে আদর কে করবে তোরে, ভাই বন্ধু প্রিয়জনে, দিবেরে বাহির করে।। খাট পালঙ্ক ছেড়ে, মন তোর বিষয় রবে পড়ে, খালি হাতে একা পথে যেতে হবেরে তোরে, চৌরাশির কোপে পড়ে, মরবি রে ঘুরে ঘুরে।। এমন সাধের জনম পেয়ে, মিছে রইলি মন তুই ভুলে, দিন থাকিতে গুরুর চরণ আগে লও সাধ্য করে, পাণ্ডু বলে সাধের জনম, হারালাম হেলা করে।।

১০৩। বিনা সাধনে তার কি পাওয়া যায়।।

 বিনা সাধনে তার কি পাওয়া যায়।। বেদ পুরাণে যার চিহ্ন নাই।। আছমান জমিন জোড়া মানুষ, মাকড়ার জালে ছাপিয়ে রয়।। কিঞ্চিৎ রূপে জগৎ আলো চর্ম চোখে টের না পায়, দিব্য নয়ন হলে পরে, দেখতে পায় সে জ্যোতির্ময়।। নিরাকারে জ্যোতির্ময় সে, তারই আকার জ্যোতির্ময়, নীরের হিল্লোলে মানুষ, স্বরূপ দ্বারে বারাম দেয়।। দেখলে সে দ্বার হয় চমৎকার, জীবে কী তার গর্ম পায়, পাণ্ডু বলে সাধুজনে যোগ সাধনে ধরে তায়।।

১০৪। আজব কারখানা বোঝা সাধ্য কার।।

আজব কারখানা বোঝা সাধ্য কার।। সাঁই করে লীলা ভবের পর।। এই মানুষে রঙ্গ রসে, বিরাজ করেন সাঁই আমার।। একটি ছিলেন দুটি হলেন, নীরে ক্ষীরে যুগোল তার, পুরুষ প্রকৃতি ঘটে, হরেক রঙ্গে দেন বাহার।। পাপীর ঘটে রঙ্গ দেখে হাকিম ঘটে দেন বিচার, দরিদ্রের ঘটে বসে ফিরতেছেন সাঁই দ্বার বেদ্বার।। পাণ্ডু বলে মানব লীলা করেছেন সাঁই চমৎকার, মানুষ ধর, মানুষ ভজ, মন যাবি তুই ভব পার।।

১০৫। ঘুমায়ে থেকনা রে মনা নয়ন খোল।।

ঘুমায়ে থেকনা রে মনা নয়ন খোল।। চক্ষু মেলে দেখ, দীনবন্ধু রূপে করে আলো।। দেখ স্বরূপে রূপ করে আলা, শুরু খোলে রূপের গোলা, চোখে উদয় চিশ কালা, ভাল একাল পর কাল।। সিংহাসনে বসে কালা, করে সখী সঙ্গে লীলা খেলা, গলায় দোলে তারার মালা, দেখে কুলবতীর কুল গেল।। দেখলে যাবে জঠর জ্বালা, খেলবি তখন সখের খেলা, পাণ্ডু বলে ওমন ভোলা, ধন্য হিরুচাদে জাগাইল।।

১০৬। যে দেখেছে বন্ধুর রূপ সেত আর ভুলবেনা।।

 যে দেখেছে বন্ধুর রূপ সেত আর ভুলবেনা।। সেরূপ দেখতে আছে কইতে নাইক, রূপের না মেলে তুলনা।। দর্পণে যে রূপ দেখেছে, মনের আধার ঘুচে গেছে, রূপে নয়ন দিয়ে আছে, দূরে গেছে পারের ভাবনা।। সদা থাকে রূপ ধিয়ানে, দেবা দেবী মানবে কেনে, মন দিয়াছে শ্রীচরণে, গুরু ভিন্ন অন্য রূপ মানেনা।। সাধ্য সাধন গোপী সনে, ভজে গুরু বর্তমানে, প্রাপ্তি হয় তার নিত্যস্থানে, অধীন পাণ্ডুর মনের ঘোর গেলনা।।

১০৭। মিলবে গুরু কল্পতরু যে করে ধিয়ান।।

 মিলবে গুরু কল্পতরু যে করে ধিয়ান।। ছত্রিশ জাতের কর্তা গুরু হিন্দু মুসলমান।। হিন্দু তরায় হরি নামে, হজরত মুসলমান, হরি হযরত একই রূপ দেখনা বিধান।। গৌরব হল কুলমানে, যার জাত সেই বড় জানে, যার নাই কুলবালা, করনা সন্ধান।। কেউ বলে নীরদ আহ্লাদিনী, কেউ বলে নবী আত্মা গণি, কেউ সুন্নতে ছাফ করে তনু, কেউ ফোঁড়ে দুই কান, এ সকল বিধির কাহিনী, দরগা দূর্গা চূড়ামণি, পাণ্ডু করে ঠেনাঠেনি, হইলনা জ্ঞান।।

পেয়েছো মানব জনম ভুলনারে আর।। আসা যাওয়া যে যাতনা, পেয়েছ মন বারে বার।। মানব জনম আল্লা দেয় যখন, করার করেছিলে করব, ভজন সাধন, করার মত কার্য হলে জনম সারা হবে তার।। মহামায়ার সংসারে এসে, একদিন পলোনা মনে যাবরে দেশে, জীবের ভুল সারিব বলে, গুরু ফেরে ঘরে ঘর।। পুণ্য মুক্তি যতই কর মন, কোন ধর্মে হয় না জন্মমৃত্যু যে খণ্ডন, পাণ্ডু বলে গুরু প্রাপ্তি হলে যাব ভব পার।।

১০৯। এমন দুর্লভ জনম হারাইওনা।।

এমন দুর্লভ জনম হারাইওনা।। পাথরে ঠুকিলে মাথা, এমন জনম আর হবে না।। চৌরআশি লক্ষ যোনী, পশু আদি শৃগাল গৃধিনী, ব্রহ্ম দরেন্দা, জনম পেেিয় মানব হয়ে, মানুষ কেন চিননা।। সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি, চার যুগে মন কোথায় ছিলি, ডুবে দেখতে হয়, মিছে দুদিনের দায় দুকূল হারায়, শেষ ভাবনা ভাবনা।। ধন পুত্র জরু মালে, কে ঠেকাবে অস্তিম কালে, কি হবে উপায়, সে দিন আপন জন্যে কাঁদবে সবায়, তোর জন্য কেউ কাঁদবে না।। ব্যথার ব্যথীত কে আছে মন, কারে বল আপন হিরুচাঁদে কয়, অধীন পাণ্ডু বলে মায়াজালে, গুরুর চরণ ভুলোনা।।

১১০। মানুষ মিলে, ভাগ্য ফলে।।

মানুষ মিলে, ভাগ্য ফলে।। ডাকে যদি ভক্তি ভাবে দীনের কাঙ্গালে।। ব্রহ্মাণ্ডের পারাপারে, মূলাধার মূলে।। নাহি দিবা নাহি রাতি মন, মানুষের মহলে, চন্দ্র সূর্য যেতে নারে সে দল কমলে, জীবের ভাগ্যে মিলবে কেনে, বেহাল না হরে।। যোগেশ্বরীর মহাযোগে মন, কলে রস খেলে, সহজ রূপে দিচ্ছে বারাম, পবন হিল্লোলে, এসে মানুষ রং মহালে, দরজা খোলে।। চিন্তামণি ভূমি বৃক্ষে মন, সে ফল ফলে, সহজ হয়ে সহজ মানুষ ধরে বেহালে, পাণ্ডু বলে মিলবে কেনে, আমার কপালে।।

বাউল
বাউল

১১১। মুরশিদ তত্ত্ব কে সুধায় তা চিত্তে নারে।।

মুরশিদ তত্ত্ব কে সুধায় তা চিত্তে নারে।। যে সুধায় জ্ঞান পাবার আশে, সে কি পুরাতন নহেরে।। রুহু ইনছানি হায়ানি, মুরশিদ বালকা এই দুই শুনি, লেখে ফোর কানে, মহামায়া রিপুর ভোলে, হায়ানি গোলমালে পড়ে, আপন মুরশিদ ইনছানিরে, না চিনে পড়েছে ফেরে।। হাওয়া লতিফা রুহানি, সবের মুরশিদ হয় ইনছানি, পূর্ব পরে তাই, মহম্মদি রুহু বহে, ইনছানি লা মোকাম নূরে, হায়ানি কালেবে থেকে, না চিনে ফের মুরিদ হয়রে।। বে মুরিদ এই অজুদেতে, কেহ নাই তা সত্য বটে, চিনারই দরকার, দয়া করে মুরশিদ দেখায়, তারে মুরশিদ বলিতে হয়, পাণ্ডু বলে আঁধার ঘুচায়, থাকব তার চরণ ধরে।।

১১২। বিছমিল্লার মানে তোরে বলব কি।।

বিছমিল্লার মানে তোরে বলব কি।। বিচেতে বিছমিল্লা আছে, শুনেছি সাধুর মুখি।। নব্বই হাজার মানে আছে বিছমিল্লায় শুনেছি, বিছের কথা না জানিলে সাধন ভজন হবে কি।। নিরাকারে ডিম্বভরে অন্ধকারে হল কি, বিছমিল্লা বলেছেন আল্লা কুদরতি এক নূর দেখি।। আদ্য মাতার আদ্য বস্তু জীবে তার জানে কি, পাণ্ডু বলে ভেদ খুলিতে ঝোরে আমার দুই আঁখি।।

১১৩। যেভাবে সাঁই করেছে আমার।।

 যেভাবে সাঁই করেছে আমার।। ভবে জ্ঞান হলনা মন তোমার।। বড় সাধ করিয়ে সাঁই দরদীরে, করলেন মানব লীলা চমৎকার।। সাঁই মনের সাধে আদম গঠেছে, স্বরূপ রসে মিশে বারাম দিতেছে, প্রভু রসে ডোবে রসে ভাসেরে, প্রভু রসের নদী দেয় সাঁতার।। যে রসে সাঁই নিত্য বিহারে, সে ভাব ব্রহ্ম আদি নরে না জানে, প্রভু জীবের জন্য সে ভাব এনেরে, কেঁদে ফেরে সদায় ঘরে ঘর।। সেভাব জানাতে দয়াল চাঁদ মোরে, বড় অমূল্য নাম দিচ্ছে সবারে, গুরু নাম না জপে প্রেম না জেনেরে, পাঞ্জুর আসা যাওয়া হল সার।।

১১৪। মন আয়না চলে যাই সাঁইজীর লীলা দেখিতে।।

 মন আয়না চলে যাই সাঁইজীর লীলা দেখিতে।। সুরধনী গঙ্গার ঘাটেতে।। জলের মধ্যে ফুল ফুটেছেরে, সৌরভে জগৎ মাতে।। ফুলের মূল রয়েছে গোলক নগরে, পাতালপুরে দীপ্ত করতেছে, সে ফুল ধরব বলে সাধু জনারে, বসে আছে যোগ ধিয়ানেতে।। ফুলের মধু পান করব বলে, দয়াল কেলে সোনা ভ্রমর হয়েছে, প্রভু গুণ গুণ স্বরে রব ধরেছে রে, জীবে না পায় জানিতে।। শুভ যোগে মেঘে সে ফুল ফুটতেছে, যেজন যোগ চিনে সেই ঘাটে বসেছে, সে কোটি তীর্থের ফল পেয়েছেরে, পেরেছে অধর চাঁদকে ধরিতে।। বড় আজব লীলা হচ্ছে সেই ঘাটে, বিষম অন্ধকারে বাতি জ্বলতেছে, পতঙ্গের মত হয়ে পাণ্ডুরে, উড়ে পড়ে পুড়ে মরিতে।।

১১৫। গুরুপদে নিষ্ঠা রতি কর আমার মন।।

 গুরুপদে নিষ্ঠা রতি কর আমার মন।। গুরুতে আসক্তি হলে খুলে যায় ভব বন্ধন।। আশি লক্ষ যোনীতে ভ্রমণ করিয়ে, মানব জনম পেয়েছরে মন, গুরু কৃপা না হইলে, জনম যাবে অকারণ।। এ সাধের জীবন যৌবন, কোন ঘড়িতে হয়ে যাবে পলকে পতন, গুরু বিনে ভবের খেলা হবেরে নিশির স্বপন।। হেলায় বেলা ডুবে এল মন, গুরুতে সম্বন্ধ করে কররে আপন, পাণ্ডু বলে দিন ফুরাল আল্লার নাম কর স্মরণ।।

১১৬। ভক্তির জোরে না ধরিলে মুখের কথায় কে পায় তারে।।

ভক্তির জোরে না ধরিলে মুখের কথায় কে পায় তারে।। ভক্তের হৃদয় হরি বসে, সদায় ঝলক দেয় অন্তরে।। বনের পশু ভক্ত হনুমান, শ্রীরাম চন্দ্রের শ্রীপাদ পদ্মে সঁপে ছিল প্রাণ, তার চিত্ত পটে রামরূপ ছিল, দেখায় হনু বক্ষ চিরে।। হরি ভক্ত ছিল বিদুরে, ভবের পর এক দরিদ্র সে অন্ন নাই ঘরে, ভক্তি জোরে তাহার ঘরে, খুদের অন্ন ভজন করে।। হরি ভক্ত মুচিরাম একজন, কেটোর জ্বলে গঙ্গা এসে দিল দরশন, গ্রামে ঘন্টা স্বর্গে বাজে, অধীন পাণ্ডু ঘুরে মরে।।

১১৭। মানুষ গুরু কল্পতরু বিশ্বাস হবে যার অন্তরে।।

 মানুষ গুরু কল্পতরু বিশ্বাস হবে যার অন্তরে।। গুরুকে গৌরাঙ্গ জেনে সদায় ঐরূপ নিহার করে।। অনুরাগে ধরেছে যারে, মন প্রাণ দেহ ধন অর্পণ করে, কুলশীলের ভয় রাখেনা, ব্রজ গোপীর ভাবে ফেরে।। মানব রূপে ফিরতেছে হরি, নিষ্ঠা রতি যার হয়েছে হরি হয় তারই, রসিক ভক্ত হরি প্রাপ্ত করতেছে ভজন করে।। ব্রজ গোপীর মহাভাব ধরে, পঞ্চভাবের পঞ্চগুণে বেধেছে তাঁরে, নিত্য সেবায় বর্ত থাকে, আত্মসুখে পাণ্ডু ফেরে।।

১১৮। গুরু কেনে ভাবনা।।

গুরু কেনে ভাবনা।। আমার অবোধ মন তুমি চেতন হয়ে দেখ না।। সে চরণ বিনে, ভব সিন্ধু নীরে, পারে যেতে পারবা না।। গুরু ধনে ধনি, যত গুণমণি, চরণের গুণি, মানব হয় পাষাণী, অমূল্য রতন, গুরুর চরণ, অমূল্য রতন, কি দিব তার তুলনা।। গুরুরূপে মন, দিয়াছে যে জন, সে জন সুজন, জর করে শমন, ধরে সে চরণ, জঠর যাতন, ঘুচায়েছে সে জনা।। যে পদ পরশে, পরশ হয় এ দেশে, বিপদে সুপদে সে পদ ভুলনা, গুরুর চরণ, জানে সাধু জন, পাপ্পু হল দিনকানা।।

১১৯। গুরু বস্তু না জেনে।।

গুরু বস্তু না জেনে।। এমন সাধের জনম, যাররে জমের ভুবনে।। স্বভাবের গুণে, কুম কুপথে গমনে, হারালি গুরু ধনে।। করিয়ে যতন, শুরু দিল ধন, সে ধন সাধনে, বঞ্চিত হলি মন, সেবা অপরাধী, নামে হলি বাদি, ঘিরে এল শমনে।। মন করিলি হেলা, ডুবে এল বেলা, ভব পারের ভেলা, শ্রীগুরুর চরণ, ভজন বিহীন, হলি চিরদিন, চরণ পাবি কোন গুণে।। করে ভবের খেলা, সুখে হলি ভোলা, ঘটে এল জ্বালা, অন্তিম সামনে, সাধন শূন্যদেহ, সুধাবেনা কেহ, বোঝেনা পাণ্ডুর মনে।।

১২০। শুনরে মন রসনা।।

শুনরে মন রসনা।। যদি কর প্রেমের বাসনা।। ভক্তি মূল্যে না কিনিলে, অমূল্য প্রেম.পাবানা।। সাধু শাস্ত্রে গেল জানা, প্রেম প্রাপ্তির উপায় ভক্তি, ভক্তি চেনা গেলনা, কিরূপ ভক্তি কি আকৃতি, জানলে হয় উপাসনা।। শুনি ভক্তি এই পদার্থ, অহং না থাকিলে তিনি, এ ব্রহ্মাণ্ড শোষিত, কি জন্য অহং মাৎসর্য করে তার প্রবঞ্চনা।। ভক্তি কোথায় হয় উৎপত্তি, ঊর্ধ্ব কি হয় অধোঃগতি, কোথায় বারাম খানা, ভক্তির সৃষ্টি কর্তা যে জন, সে বা হয় কেমন জনা।। ভক্তি চিনে কর সাধ্য, ভক্তি দেশে সাঁইজী এসে, প্রেমরসে হয় বাধ্য, হিরুচাঁদ কয় অধীন পাণ্ডু, মানব দেহে দেখনা।।

আরও পড়ুন:

“ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী : ৪র্থ পর্ব”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন