ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী : ২য় পর্ব

ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী : ২য় পর্ব

ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ
ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

Table of Contents

ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী

৩১। আদমেরে কি দোষে খোদায়।।

আদমেরে কি দোষে খোদায়।। বেহেস্ত হইতে তা’রে এ ভবে ফেলায়।। গন্দম যে মানা হল কে গন্দম খাওয়াইল সাঁই গো, কারে দোষী করি বল, কি করি উপায়।। পয়দা করিলে তারে, ভালবাস আদমেরে সাঁই গো; তোমার যে ভালবাসা, মন্দ কেনে তায়।। তোমার যে বে হুকুমে, কেহ নাহি কোন কামে সাঁই গো, জারা বালি নাহি নড়ে, শুনেছি তাহাই।। দীন পাণ্ডু কেঁদে বলে, কি লিখেছে এ কপালে সাঁই গো, ভালবাসা কিসে হব ভাবি তাই।।

৩২। ফকির হয়েছি আল্লার রাগেতে।।

ফকির হয়েছি আল্লার রাগেতে।। সাধুগুরু চরণ ধূলি দাওগো আমার মাথাতে।। কত রাশি রাশি পাপের কর্ম করে ছিলাম এই হাতে।। ছবরকে বলিলাম মাতা, এ কিনকে, মাতা, আল্লার নাম মোর হৃদয় গাথা, মুরশিদ বন্ধু যাই সাথে।। ধনির ধন ফুরায়ে গেলি, পথের ফকির হয় তার গালি, পাপের ভারা দিলাম ফেলি, চালাও গুরু সুপথে।। লয়েছি এমানের ঝুলি, আর কি কলঙ্কে ভুলি, এসেছি এ সাধুকুলে, চলিব হাসতে খেলতে।। সাধু গুরু দয়া কর, পতিত পাবন নামটি ধর, পাণ্ডু বলে দাও কিনারে, হয় না যেন ফিরিতে।।

৩৩। ডোর কৌপীন দাওগো মুরশিদ আমারে।।

ডোর কৌপীন দাওগো মুরশিদ আমারে।। কাঙ্গাল হব মেঙ্গে খাব, আল্লাজীর দ্বারে।। সুখের শয্যা ত্যাজ্য করে এসেছি সাধুর দ্বারে।। পূর্ণ হল ভবের খেলা, ভেবে দেখি গেল বেলা, ঘিরে এল শমন জ্বালা, থাকি মরার হাল পরে।। স্কন্ধে লয়ে আছলা দোলা, ভিক্ষার ছলে বলব আল্লা, তাতে যদি বারি তালা, অধমের দয়া করে।। কোথায় ছিলাম ভবে এলাম, কুল বলে মুই ভুলে রলাম, ভোজের বাজী করে গেলাম, কোন গুণে পাব তারে।। কি করিবে ভবের কূলে, সঙ্গে নাহি যাবে মলে, অধীন পাণ্ডু বলে চরণ ভিক্ষা, দাও সাঁই মোরে।।

৩৪। ঠিক রেখ মন নবীর তরিক সই ষোল আনা।।

ঠিক রেখ মন নবীর তরিক সই ষোল আনা।। দর্জালের আমলে তরিক ঠিক রবে না।। (হায়) দর্জালের আমল হবে, বলেছে মুরব্বি সবে, হবে তা আখেরি জামানায়, আখেরি জামানার কিছু হচ্ছে নমুনা।। (হায়) দরবেশের চেলা যত, বিচার করে আত্ম মত, সাধু গুরুর বাক্য মানেনা, নিজ বুদ্ধি বড় জেনে দেয় উপাসনা।। (হায়) হাদিছ পড়ে আলেম হল, এলমের জোর সে করিল, তম করে মুরশিদ ভজে না, মোরশেদ বিনে নবীর তরিক, ঠিক রবে না।। (হায়) নবীর তরিক ভুলে গেল, হিংসা নিন্দা বৃদ্ধি হলো, খোদার বান্দা ভেবে দেখ না, পাণ্ডু বলে দিনের বাতি আঁধার কোরো না।।

৩৫। এ জামানায় নবীর তরিক ঠিক রাখা দায়।।

এ জামানায় নবীর তরিক ঠিক রাখা দায়।। ধোকাবাজী ছন্দি কথায় মন ভুলে যায়।। নবীজীর আইন মত, রাছুলোত্মার অনুগত, হয়ে থাক মমিন সবায়, পড়োনা পড়োনা কেহ কাহারও ধোকায়।। মিথ্যাবাদীর নেকী যত হয়ে যাবে বরবাদ, দলিলেতে লেখা আছে তাই, ভেবে দেখি সত্যবাদী ভবিষ্যতে হয়।। সন্ন্যাসী উদাসী যত, আলেম ফাজেল মোল্লা কত, ছল কথা সকলেত কয়, ভেবে মল উম্মি লোকে কি করি প্রত্যয়।। দিন গেল দুনিয়ার লোভে, নিকাশের দিন কিবা হবে, অধীন পাণ্ডু ভেবে ইহা কয়, তরিকে ঠিক রাখ মুরশিদ হয়ে দেখ না।।

বাটিক প্রিন্টিং এ বাউলচিত্র
বাটিক প্রিন্টিং এ বাউলচিত্র

৩৬। শ্রীচরণ পাব বলে ভব কূলে ডাকে দীনহীন কাঙ্গালে।।

শ্রীচরণ পাব বলে ভব কূলে ডাকে দীনহীন কাঙ্গালে।। পড়ে এই ঘোর সাগরে, কেউ নাই মোর, ঘিরে নিলো মায়াজালে।। সৃষ্টি করে আপ্তরসে, কোন বা দোষে, কালের বশে ফেলাইলে, কার ভাবে এসে, বেহাল বেশে দয়াল নাম প্রকাশিলে।। পতিত পাষণ্ড যারা, গেল তারা, মার খেয়ে তার চরণ দিলে, আমি হলাম এতই পাপী, দুঃখী তাপী, আমার ভাগ্যে লুকাইলে।। কল্পতরু নামটি ধর, বাম নয় কারো শুনে এলাম সাধু কূলে, দয়াল নামের মহিমা যাবে জানা, এই অধীনে চরণ দিলে।। গোসাঁই হিরুচাঁদের চরণ, হয় না স্মরণ, ভজনহীন তাই পাণ্ডু বলে, আমায় না চরণ দিলে, একই কালে, মানব জনম যায় বিফলে।।

৩৭। গুরুপদে নিষ্ঠারতি হয়না মতি, আমর গতি হবে কিসে।।

গুরুপদে নিষ্ঠারতি হয়না মতি, আমর গতি হবে কিসে।। মন আমার মূঢ়মতি, সাধন ভক্তি, হলো না মোর মনের দোষে।। মন আমার দিবারাতি, গুরু প্রতি থাকত যদি চরণ আশে, তবে চরণ দাসি হতাম ব্রজে যেতাম, থাকতাম ঐ চরণে মিশে।। পেতাম যদি সাধু বৈদ্য, মনের বেয়াদ্য, সেরে দিত সেই মানুষে, লেগে চরণের জ্যোতি, জ্ঞানের মতি, সদায় হয়ে উঠতো ভেসে।। দীনহীন পাঙ্গুর উক্তি, চরণ রতি, পান করিতাম ঘরে বসে, বাঁচতাম শমনের হাতে, অস্তিমেতে সদয় হতেন গুরু এসে।।

৩৮। গুরু দয়া কর মোরে গো বেলা ডুবে এল।।

গুরু দয়া কর মোরে গো বেলা ডুবে এল।। চরণ পাবার আশে, রলাম বসে সময় রয়ে গেল।। অমূল্য ধন লয়ে হাতে, ভবে এসেছিলাম ব্যাপার বলে, ছয়জনা বোম্বেটে জুটে, পথ ভুলায়ে সেধন লুটে নিলো। বেলা গেল সন্ধ্যা হল, যম রাজার ডঙ্কা বাজাইল, মহাকালে ঘিরে এল, সঙ্গের সাথী কেহই নারে হল।। কি হবে অন্তিমকালে, রয়েছি বিনা সম্বলে, পাণ্ডু বলে গুরু ভুলে, সাধের জনম বিফলেতে গেল।।

৩৯। আমারে ফেলনা গো মুরশিদ দয়াল হয়ে।।

আমারে ফেলনা গো মুরশিদ দয়াল হয়ে।। চাতকের মত, আমি তোমার চরণ পানে চেয়ে।। অধম তারণ নাম শুনেছি, তাইতে কুল ছেড়ে বেহাল হয়েছি, ভব মাঝে পতিত হয়ে, ফিরতেছি কলঙ্কের ডালি বয়ে।। তোমার রূপে নয়ন দিয়ে, যাই যদি নরকী হয়ে, দয়াল বলে কেউ ডাকবে না ওগো মুরশিদ আমার হাল দেখিয়ে।। শুনে তোমার নামের ধ্বনি, ডাকতেছি এই রাত্রি দিন, পাণ্ডু বলে গুণমণি, দয়া কর শ্রীচরণ দিয়ে।।

৪০। দয়াল দরদী, কাঙ্গাল এল তোমার দ্বারে।।

দয়াল দরদী, কাঙ্গাল এল তোমার দ্বারে।। অক্ষয় ভাণ্ডার তোমার কেউ যাবে না ফিরে।। সর্বধনের দাতা তুমি ত্রিমহীমণ্ডলে, বিনা মাঙ্গায় কত ধন শুরু দিয়াছিলে মোরে, আর কোন ধন চাই না গুরু, চরণ দাও আমারে।। কুলের বাহির হলাম আমি, চরণ পাব বলে, কত মহা পাপীর দিলে চরণ তাই এসেছি শুনে, দাঁড়ালাম দরজায় এসে স্কন্ধে ঝুলি করে।। দাও কি না দাও রাঙ্গা চরণ, বেলা গেল চলে, দাতার চেয়ে বখিল ভাল তুড়ুক জবাব দিলে, পাণ্ডু বলে জবাব পেলে, যাই আমি চুপমেরে।।

বাউল
বাউল

৪১। দয়াল ধনি, আমি ডাকি ঐ নাম শুনি।।

দয়াল দরদী, কাঙ্গাল এল তোমার দ্বারে।। হেলায় চরণ দিতে পার, দিবা না সাঁই কেনে।। যা কর তাই করতে পার, এ তিন ভুবনে, ভক্ত রক্ষা করলে যেতে স্ফটিক স্তম্ভনে, তোমার স্মরণে প্রহ্লাদ মলোনা বিষ পানে।। তাই শুনে হয়েছি পাগল, পাপ পুণ্য জানিনে, সুধা বলে গরল খেলাম, তোমার ধিয়ানে, আমারে দিবানা চরণ কিসের কারণে।। প্রাণ সঁপেছি মান সঁপেছি, চরণ পাব বলে, পাণ্ডু বলে দাওনা চরণ ভেবেছ কি মনে, ধর্মেতে সবে না তোমার, বলছে দীনহীন।।

৪২। আমারে দাও চরণ তরি।।

আমারে দাও চরণ তরি।। তোমার নামের জোরে পাষাণ গলে অপারের কাণ্ডারী।। ভক্ত অধীন নামটি শুনেছি, ভক্তের পিছে ফিরতেছ হরি, ভক্তিহীন হয়েছি আমি, স্মরণ নিলাম তোমারই।। নির্ধনের ধন অন্ধলার নড়ি, দুর্বলের বল হও গুণমণি, পাপী তাপী সব তোমারই আমায় ফেলনা হরি।। অহল্যা এক পাষাণী ছিল, চরণ ধুলায় সেও মানব হলো, পাণ্ডু কাঁদে ঘোর তুফানে, পারের উপায় কি করি।।

৪৩। বড় চিন্তা ঘুণ লেগেছে আমার অন্তরে।।

বড় চিন্তা ঘুণ লেগেছে আমার অন্তরে।। মুরশিদ কোন গুণে পাব তোরে।। আমার দুই নয়ন ঝোরে, দুঃখ বলব আর কারে, কে মোর ব্যথার ব্যথীত—আমার কেবা আদরে, আমি প্রেম সাগরে ভাসাই তরি রে, আমার ডুবলো ভারা কিনারে।। আমার মন পাগল পারা, হয়না নিহারা, বনে বনে কেঁদে ফিরি, আমি পাইনা অধরা, যমন কলমী লতা জলে ভাসেরে, তমনি ফিরতেছি দ্বারে দ্বারে।। দুঃখ কই যারে তারে, এই ভব সংসারে, তোর বিনে ভরসা নাই, গুরু চরণ দাও মোরে, অধীন পাণ্ডু বলে মুরশিদ বিনে রে, কেঁদে ফিরতেছি দ্বারে দ্বারে।।

৪৪। ক্ষম হে অপরাধ।।

ক্ষম হে অপরাধ।।  দাসি করে অনুরোধ।। তুমি দীনবন্ধু করুণাসিন্ধু, আমারে দিওনা বাদ।। গগন চন্দ্র উদয় করো, তিমীর পাপী তাপী সবাকার, জ্যোতি লাগে তার, কোটি চন্দ্র যিনি কিরণ, নামটি শুনি দয়াল চাঁদ।। সৃষ্টিকর্তা তোমায় দেখি, কেন কর দুঃখী তাপী, ভক্তের কর দীপ্ত আঁখি, পাপীর অন্ধকার, করো কারো দীপ্ত কারো অন্ধ, তুমি আবার কেমন চাঁদ।। তুমি বাঞ্ছা কল্পতরু, পতিত পাবন জগৎ গুরু, পাণ্ডু বল করে না কারো, যা কর এবার, তোমার নামের জোরে পাষাণ গলে আমার গলায় মায়া ফাঁদ।।

৪৫। যা কর হে এবার।।

যা কর হে এবার।। গুরু দিলাম তোমায় ভার।। ভবে মাতা পিতা জ্ঞাতী বন্ধু; সঙ্গের সাথী কেউ নাই আর।। মুচির ছেলে রামদাস ছিল, গুরু ভজে সাধু হলো, কেঠোয় গঙ্গা সে দেখল, জগতে প্রচার, শুনি ত্রাসে ঘন্টা স্বর্গে বাজে, এতই দয়া করলে তার।। জোলার ছেলে কবীর ছিল, গুরু সেবা সে করিল, ছত্রিশ জাত তুড়ানী খেলো, জগন্নাথে তার, ভবে জানা গেল তীর্থ ধর্ম, গুরুর চরণ হলো সার।। গুরু সেবা যে করিল, শমন জ্বালা দূরে গেল, জগতে নাম প্রকাশিল, দাস হলো তোমার, পাণ্ডু কেঁদে বলে গুরু, ফাঁকি দিওনা আমার।।

বাউল
বাউল

৪৬। ও দয়াল চাঁদ আমারে।।

ও দয়াল চাঁদ আমারে।। তোমার ঐ চরণে দাসি কর মোরে।। তোমার আশার আশে রলাম বসে হে, দয় কর ভজন হীনেরে।। এ অধীনে না তরালে হে, দয়াল বলি কোন গুণে, দয়াল নামের গৌরব যাবে, কে ডাকবে তোমারে, পাপী তাপী উদ্ধারিলে হে, শুনেছি সাধ বাজারে।। দীন বন্ধু করুণা সিন্ধু হে, পতিতের কাণ্ডারী, জগাই মাধাই উদ্ধারিলে, মার খেয়ে তাহারই, তাই শুনিয়ে তোমায় ডাকি হে, দয়ার ফেলনা কাঙ্গালেরে।। দয়া যদি না করিবে হে, ত্রিমহি মণ্ডলে, তোমা বিনে কে আছে মোর, বলিব কাহারে, অধীন পাণ্ডু বলে যা কর হে সাঁই, আমি রয়েছি আশা করে।।

৪৭। দয়া কর গো সাঁই।।

দয়া কর গো সাঁই।। এই ভবে আমার কেহ নাই।। বলি চরণে তোমায়।। পিতৃধন যতনে লয়ে এসেছিলাম সাধ করিয়ে, এ ভবে জুয়োচোরে লুটে নিলো তাই।। ঘিরে নিলো জালে, ত্রিবেণী ধরিল কালে, সে কালে চোর আশি ঘুরালো আমায়।। মণিহারা ফণী হয়ে, মলাম ভূতের বোঝা বয়ে, মনরে সাধের জনম বিফলেতে যায়।। অধীন পাণ্ডু কেঁদে বলে, পতিত পাবন নাম ধরিলে, জানিব অস্তিম কালে, যদি চরণ পাই।।

৪৮। আমায় কিসে শুরু করবেন পার।।

আমায় কিসে শুরু করবেন পার।। পারের ঘাট না চিনে, ভাব না জেনে, সাগর বলে উলুবনে দেই সাঁতার।। ঘাটে জাহাজ পুরে আসে রতন কাঞ্চন, ঐ জাহাজে আছে খোদ মহাজন, বিলাচ্ছে সেজন, মহারত্ন ধন, না চিনে সে ধন হবেনা কিনার।। ঐ ঘাটের কূলে বসে আছে যেবা জন, লাভ করিছে সদায় অমূল্য রতন, ধরে শ্রীচরণ, পারে যাবি মন, ঘুচে যাবে ভবের ঘোরাফেরা তার।। ঐ ঘাটে ঘোড়াফেরা করি সর্বক্ষণ, না চিনি সে ঘাট একি বিবরণ, জাহাজের ধন জলে ফেলে মন, পাণ্ডুর হলো আদা পেঁয়াজ বেচা সার।।

৪৯। ভজনহীন বলে গুরু আমার হালের কাটা ছাড়িয়াছে।।

ভজনহীন বলে গুরু আমার হালের কাটা ছাড়িয়াছে।। জ্বরাতরি ভরাগাঙ্গে মনরায় ভাসায়েছে।। এ ভবসাগরে তরি ঘুরলো পাকে ঘুরতেছে।। হয় জনা ছিল দাড়ি, সদায় করিছে আড়ি, উঠে এল বিষয় ঝরি, চৌষট্টি ঢেউ বাঁধিয়াছে।। দশখানে উঠছে পানি, সেচে পার না পাই আমি, ডুবে এল সাধের তরি, পালের কানি এড়িয়াছে।। অধীন পাণ্ডু কেঁদে বলে, একপালে কূল না মেলে, দেবংশে ধন নৌকায় ছিল, তাইতে দশা ঘটিয়াছে।।

৫০। গুরু কোন রূপে কর দয়া ভুবনে।।

গুরু কোন রূপে কর দয়া ভুবনে।। অনন্ত অপার লীলা তোমার মহিমা আর কে কানে।। তুমি রাধা তুমি কৃষ্ণ, মন্ত্রদাতা তুমি ইষ্ট, মোর কানে মন্ত্র জানতে সঁপে দিলে সাধু বৈষ্ণব গোসাঁইর চরণে।। নবদ্বীপে গৌরাঙ্গ চাঁদ, শ্রীক্ষেত্রে হও জগন্নাথ, তাই শুনি, সাধু বাক্য ইহাই হল, দয়া হবেনা স্বরূপ বিনে।। বৃন্দাবন আর গয়া, কাশী, বালাকুণ্ড, বারাণসী, মক্কা মদিনা, তীর্থে যদি গোউর পেত, ভজন সাধন করে জীবন কোনে।। সাধু গুরুর চরণ পদ্মে, সর্ব সর্বতীর্থ আছে বর্ত, তা জানিনে, পাণ্ডু বলে অবোধ মন তোর মতি সরল হবে কোন দিনে।।

বাউল
বাউল

৫১। না ভজে সাধের জনম বিফলে যায়।।

না ভজে সাধের জনম বিফলে যায়।। গুরু আমার সত্য দয়াময়।। দয়া করে দীনবন্ধু, গুরু রূপে এসে, কিবা যবন কিবা হিন্দু চক্ষুদানী দেয়।। যখন ভবে এলে, বলেছিলে গুরুর চরণ সাধন মনের সাধে, জননী জঠরে জন্যে, নিল মহামায় ঘিরে, ভুলে গেলাম পূর্ব কথা, পেটের জ্বালায়।। গুরুর বলে তোরে, সাধু হেল্লায় বনের কাষ্ঠ চন্দন হতে পারে, কুমতি কুস্বভাবে, হলো মাৎসর্য উদয়, সাধু গুরু পদে আমার, মতি নারে হয়।। জনম গেলাম হেরে, শমন ভুবন যেতে হবে, সেদিন এল ঘুরে, এ ভবের বন্ধু যারা, পর হয়ে যাবে তারা, পাণ্ডু কেঁদে বলে সে দিন কি হবে উপায়।।

৫২। অযোগ্য বলে গুরু ফেলনা আমায়।।

অযোগ্য বলে গুরু ফেলনা আমায়।। আমি চরণ দাসের যোগ্য নয়।। যোগ্য লোকের দরা শুরু করে জগতে সবায়, তোমাবিনে অধম জনে কেহ না সুধার।। দয়াল সাধু মুখে শুনি, পাষাণ দলন পতিত পাবন তোমার নামের ধ্বনি, তাই শুনিয়ে স্মরণ নিলাম, যদি দয়া হয়, এ জগতে আমা বলতে আর ত কেহ নাই।। গুরু শুনি তোমার রায় জগাই মাধাই মেরেছিল, কাঁদা ফেলে গায়, বুকে বহে রুধির ধারা, তবু হয়ে দয়াময়, হরি নাম দিয়ে তারে, কোলে দিলে নিতাই।।

শুনি অহল্যা এক নারী, মুণি পত্নী স্বামীর বাক্যে, পাষাণ হলেন তিনি, চরণ ধুলা দিয়ে তারে, মানব করলে তায়, অধীন পাণ্ডু চেয়ে আছে, ঐ ধুলার আশায়।।

৫৩। গুরু গো কোন গুণে আর তোমায় পাব।।

গুরু গো কোন গুণে আর তোমায় পাব।। যে দিন একা পথে পারে যেতে, ভবলোক ছেড়ে।। ভুলে মহা মায়ার ভোলে, মন গেলেনা সাধুর দলে, ভাবনা মন একই কালে, কিসে কাল কাটাব।। মন ভবের হাটে জুয়া খেলে, গুরু বস্তু ধন হারালে, হায়রে মন কি করিলে, কারবা দোষ আর দিব।। ওমন কি করিতে কিবা হলো, নিকাশের দিন ঘুরে এল, অধীন পাণ্ডু কেঁদে বলে, কার পানে চাহিব।।

৫৪। আমি কি হলাম তোমায় ভিন।।

আমি কি হলাম তোমায় ভিন।। কত পাষণ্ড পামর গুরু তারে দিলে শুভদিন।। এ ভব সাগরে গুরু ঘুরে মল দীনহীন।। বানায়ে সাধের ভরি, বোঝাই দিয়ে নীর ও ক্ষীর, হেন তরি সঁপে দিলে, কুমতি এক মাঝির টিন।। তোমার তরি তুমি মাঝি, হলে বাঁচে দীনহীন, কেন রিপু ইন্দ্র মায়ার হাতে দিয়ে খুলে চিরদিন।। যা করাও তাই করি গুরু, এ তরির তুমি স্বাধীন, স্বাধীন হয়ে সাধ্য পথে আমায় করলে পরাধীন।। ভব নদীর মাঝে পড়ে, পালাম না ত কূলের চিন, দয়ার নাম প্রকাশে গুরু, অধীন পাণ্ডুর দাও গো দিন।।

৫৫। পাপী বলে আমায় ফেলনা।।

পাপী বলে আমায় ফেলনা।। তোমার ধর্মে সবেনা।। ধর্ম বলতে তুমি ধর্ম কর্ম ফলতো গেলনা।। তোমার ধর্মের দয়াল স্বভাব, আমার নাইতো পাপের অভাব, এ পাপীরে উদ্ধারিতে দয়াল স্বভার ছেড়না।। বন্ধু বান্ধব যত ছিল, আমা বলতে কেউ না হোলো, তো বিনে এ পাপীর বন্ধু আর কে আছে বলনা। পতিত পাবন নামের ধন্য, শুনে পাপী করে দৈন্য, পাণ্ডু হলো সাধন শূন্য, তাইতে গণ্য হলোনা।।

বাউল
বাউল

৫৬। তুমি বাঞ্ছা কল্প তরু বাঞ্ছা পূর্ণ করোনা।।

তুমি বাঞ্ছা কল্প তরু বাঞ্ছা পূর্ণ করোনা।। বাঞ্ছা করি চরণ পাব, কর্ম ফলতো রবেনা।। বড় বাঞ্ছা মনে করি, ডাকি তোমায় বলে হরি, পাপ তাপ হর হরি, আশাতে নিরাশ করোনা।। শুনে বাঞ্ছা করি হরি, মার খেয়ে দাও চরণ তরি, জগাই মাধাই দু’ভায়েরই, আমায় কি চোখে দেখনা।। অহল্যা পাষাণী ছিল, চরণ ধুলায় মানব হলো, তারা কি তোর আত্ম ছিল পাণ্ডু কি তোর কেউ হলোনা।।

৫৭। দিন আমার গিয়াছে, দিনমণি লুকাইয়াছে।।

দিন আমার গিয়াছে, দিনমণি লুকাইয়াছে।। বন্ধুগুরু কোথা রয়েছে।। মন আমার হয় উদাসী, কার সনে পোহাব নিশি মনের বাসনা মনে বসে রয়েছে, জানি কার বাসরে, বন্ধু পালিয়েছে।। মন একা ভবে এল, গুরু এসে দোসর হলো, পাষণ্ড মন আমার দোসর ছেড়েছে, তাইতে আশা বৃক্ষ ছেদন হয়েছে।। ঘোর নিশি চোখে ছানি, আমি হলাম একাকিনী, কিসে পোহাই রজনী কম্প হয়েছে, অধীন পাণ্ডু গুরুর দোহাই দিতেছে।

৫৮। গুরু তুমি ফেলনা অধমে।।

গুরু তুমি ফেলনা অধমে।। বাঞ্ছা আছে গোলাম হব তোমার কদমে।। অযোগ্য হইয়ে মুই, কদমেতে ছায়া চাই সাঁই গো, বাঞ্ছা হয় তব রূপ ভাবি দমে দয়ে।। তোমা পানে যেবা চায়, রিপু তার বাদি হয়, সাঁই গো, রিপু শান্ত করি আমি বল কোন কামে।। দয়া কর দয়াময়, ভেবে দেখি বেলা নাই সাঁই গো, কোন ঘড়ি এসে মোরে, ধরে নিবে যমে।। চালাও সিদা রাহে সাঁই, তোমায় যেন তুলি নাই সাঁই গো, পাণ্ডু বলে এমান যে হয় আল্লার নামে।।

৫৯। আমার কি এত দয়া হবে।।

আমার কি এত দয়া হবে।। জগতের স্বামী এই কপালে মিলিবে।। জনম না পাকে যায়, পাক দেহ হলো নাই সাঁই গো, ভক্তিহীন জীবের দয়া কিসে বা হইবে।। জীবের জীবন ধন, আহারে সে নিরঞ্জন, সাঁই গো, এমন অধম জনে কেন দেখা দিবে।। ভজন নাহিক, কোন গুণে গুণমণি, সাঁই গো, এমন যে অভাগিনী, দাসি বানাইবে।। গেল জনম বিফলে, ঘিরে নিলো মায়াজালে সাঁই গো, পাণ্ডু বলে অন্তিমকালে, বাম না হইবে।।

৬০। আমার কপালে এই ছিল।

আমার কপালে এই ছিল। গোনাগার হয়ে জনম বিফলেতে গেল।। সময় যে মন্দ হলে, দোস্ত বন্ধু যায় ফেলে সাঁই গো, নিদানের বন্ধু গুরু দয়া না করিল।। কৃয়া হতে ইউছুফের, খালাস করিলে তারে সাঁই গো, এই অধমের দয়া তোর নাহি হল।। কত কত পাপী লোকে, দয়া যে করিলে তাকে সাঁই গো, আমার কি পাপ আত্মা মাফ না হইল।। বড় সাধ মনে করে, ধরেছিনু মুরশিদেরে, সাঁই গোঁ, তাহার কদম মোর কপালে না হলো।। পাণ্ডু বলে ওহে বারি, আমিত অবলা নারী, সাঁই গো, দাও গো চরণ তরি দিন বয়ে গেল।।

আরও পড়ুন:

“ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী : ২য় পর্ব”-এ 3-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন