ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী : ৩য় পর্ব

ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী : ৩য় পর্ব

ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী : ৩য় পর্ব
ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

 

Table of Contents

ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী

৬১। চরণ ভিক্ষা দাও সাঁই মোরে।।

চরণ ভিক্ষা দাও সাঁই মোরে।। ফেলনা ফেলনা আল্লা এই অধমেরে।। মাতা পিতা বন্ধু ভাই, ভেবে দেখি কেহ নাই সাঁই গো, পাপী বলে দয়া আল্লা কর কাঙ্গালেরে।। এই ভবে আসা কালে, আসিয়াছি খুশী হালে, সাঁই গো, লাভে মূলে ফুরাইল, সঙ্গে যাবে কে রে।। নেকী বদি তেরা সাঁই, আমি কিছু জানি নাই, সাঁই গো, নেক বান্দা, ভাল তেরা, বদির কি তুই নয়রে।। পাপীর দয়াল তুমি, শুনে বল করি আমি, সাঁই গো, নেকেরে করিলে দয়া ডাকি কেনে তোরে।। হীন পাণ্ডু কেঁদে বলে, গুরুর চরণ তলে, সাঁই গো, অস্তিম কালেতে ফাঁকি দিওনা আমারে।।

৬২। নিজগুণে দয়া কর গুরু ভজন না জানি।।

নিজগুণে দয়া কর গুরু ভজন না জানি।। ভজনহীন হয়ে ডাকি দয়াল নাম শুনি।। তুমি দীনের ধনী, আমি হই দীনহীনি, চাতকিনী হয়ে ডাকি পাব চরণ দু’খানি।। আমি নির্জনে এক দাসি হয়েছি, তোমার নামের জোরে ডঙ্কা মারতেছি, নামে ভাসালাম তরি, যদি ডুবিয়া মরি, তবে আমা হতে নামের গৌরব যাবে ও গুণমণি।। তোমার নামের জোরে অধম তরে যায়, আমি চেয়ে আছি ঐ নামের আশায়, আমি বড় অভাগী, কোন উপায় না দেখি, ভরসা করি তরে যাব নামে, এ ঘোর তুফানি।। এবার যা কর এই দীনহীনেরে, পড়ে রলাম চরণের আশা করে, অধীন পাণ্ডু কয় বাণী, আমি এই ভিক্ষা মাঙ্গি, তোমার রূপে নয়ন থাকে যে এ দিন রজনী।।

৬৩। গুরু চরণ ধরে পারে যাব গো, মনে ছিল বাসনা।।

গুরু চরণ ধরে পারে যাব গো, মনে ছিল বাসনা।। স্বভাব দোষে রিপুর বশে, হারালাম ষোল আনা।। ভব সাগর বিষয় নদী গো, নদীর কূল বহুদূর, তুফান দেখে হত হলাম, কিসে পাব কূল, আমার কপাল দোষে পারের তরি, ভবে চেনা গেল না। দুঃখী তাপী দেখে দয়াল গো, ভাল তরি সাজায়েছে, তাতে রাধা নামে বাদাম তুলে ঘাটে এসেছে, ঐ নামের সুধায় জগৎ ভাসে মন কেনে তায় ডোবেনা।। বেহাল বেশে দয়াল চাঁদ গো, ভাল ঘাটে এসেছে কত পাপী তাপী অনায়াসে পারে নিতেছে, সাঁই হিরু চাঁদ কয় অধীন পাণ্ডু, ঘাটে কেন বসনা।।

৬৪। আমার মনের কথা এ জগতে গো, আমি বলিব আর কার কাছে।।

আমার মনের কথা এ জগতে গো, আমি বলিব আর কার কাছে।। শুরু বিনে এ জগতে আমা বলতে কে আছে।। দয়া করে রূপ দেখায়ে গো বেহাল বানাইলে, কু-স্বভাব এই দেহে কেন বা রাখিলে, একূল ওকূল দু’কূল গেল কলঙ্ক হলো মিছে।। ষোল আনা এনেছিলাম গো, ব্যাপারের আশে, সাধের তরি বোঝাই করে, যাবরে দেশে, ত্রিবেণীর তিরধারে, তরি মারা গিয়াছে।। মণিহারা ফনী হয়ে গো, ভবে ঘুরাইলে, চৌরাশীর কোপে পলাম শ্রীচরণ ভুলে, পাণ্ডু কাঁদে কর্ম ফাঁদে মানব জন্ম যায় মিছে।।

৬৫। কি দিয়ে ভজিব গুরুজীরে।।

কি দিয়ে ভজিব গুরুজীরে।। ভজনের কথা শুনি হাট বাজারে।। এমান আমান নাই, কোন গুণে গুরু পাই, সাঁই গো, গুরুকে ভজিতে সদা সাধু বলে মোরে।। দুধ দিয়া ভজিব গুরু আগে তাহা খায় গরু সাঁই গো, এটো দ্রব্য গুরু নিবে এমানের জোরে।। ভাত মাছ যত খাই, তাহাতে কি সেবা হয়, সাঁই গো, ভক্তি বিনে গুরু সেবা কিছুতেই নাইরে।। মন দিয়ে ভজি তাই, সে মন আমার নয়, সাঁই গো, কি দিয়ে ভজিব গুরু, দিশা নাহি হায়রে।। অমাপা অজপা সেই, গুরুসেরা তাহাতেই, সাঁই গো, পাণ্ডু বলে অমাপা যে বলে এমানেরে।।

বাউল
বাউল

৬৬। যার হয়েছে নিষ্ঠারতি।।

যার হয়েছে নিষ্ঠারতি।। গুরুপ্রতি সদায় মতি, গুরু ভিন্ন নাই গতি।। তার সাক্ষী দেখ রাম অবতারে, হনু শিষ্য রাম নিষ্ঠা করে, কৃষ্ণ পশুর হলো, নিষ্ঠা প্রেমের এই রীতি।। গুরু নিষ্ঠ হলে ভজনের উপায়, আছে সত্য সর্ব শাস্ত্রে কয় সত্য প্রেমী গণ্য হয় তার, শমন পারে না ছুতি।। যার বাঞ্ছা আছে শ্রীচরণ বলে, পরের কথায় সে কি যায় টলে, ভুলোনা মন কারো ভোলে, করি তোমায় মিনতি।। যমন গোবরে পোকা ভ্রমরের সাথে, পীরিত করেছিল জগতে, পাণ্ডু বলে সৎএর সঙ্গে মলেও হয় গঙ্গাপ্রাপ্তি।।

৬৭। হেলায় হেলায় দিন ফুরালো।।

হেলায় হেলায় দিন ফুরালো।। বেতাইনি বেলা জানি কয়টা বেজে গেল।। দিন থাকিতে মন রসনাহে, মুখে আল্লার নাম সদায় বলো। আশা করো বিষয় করে হে, বড় সুখে রবা, ভেবে দেখ মন শমন এলে, কোন বা দেশে যাবা, অন্তিমকালে মধুসূদন হে, মন কার ভোলায় সে নাম ভোলো।। যা হবার তা হলো ভবেহে, ত্বরায় দোকান সারো, যে ধন আছে সে ধন নিয়ে মন, সাধ বাজারে চল, বড় লাভের বাজার মন রসনা হে, ঐ লাভ হবে পথের সম্বল।। বাজারেতে সন্ধান জেনে হে, প্রেমের ঘাটে নামো, অমূল্য ধন পাবা হাতে, সরল হয়ে ডোবো, পথ না চিনে সে ঘাট ভুলেহে, অধীন পাণ্ডু জনম হারালো।।

৬৮। মুখে বললে কি হয়, গুরু ধরে সাধন জানতে হয়।।

মুখে বললে কি হয়, গুরু ধরে সাধন জানতে হয়।। ডুবে দেখ মনরায়।। নিষ্ঠা রতি যার হয়েছে, রস রতি সেই চিনেছে, এ ভবে উজানে সে তরি বেয়ে যায়।। তিন রতি তিন রসের খেলা, জানিলে মন যায় রে জ্বালা, এ সাধন দয়া করে গুরু যারে কয়।। আছমানে তিন রতি বয়, জমিনে তিন রসের উদয়, সুরসিক শুভযোগে মিলন করে তায়।। অধীন পাপ্পু কেঁদে বলে, গুরু সুখের সুখী হলে, সে জনে সহজ মানুষ ধরেছে নিশ্চর।।

৬৯। এস মন পারের চিন্তা বসে করি।।

এস মন পারের চিন্তা বসে করি।। এনে মহাজনের ধন, ভবের হাটে মন, হারাবি সে ধন করিলে দেরী।। মায়া দাগাদার তারই কারবার, এই হাটে মন হবে না বেপার, এমনি দাগাদারী সদায় ভিলকী মারী, মহাজনের ধন করিল চুরি।। এস পার ঘাটার কলে বসি যেয়ে মন, পারের তরী সদায় করিগে স্মরণ, এসেছে একজন, দয়াল সে জন, গুরু বস্তু ধন নিতাই কাণ্ডারী।। পারের কাণ্ডারী কেবল আছে গুরুধন, না চিনিলাম তারে বিধি বিড়ম্বন, হিরুচাঁদ ভনে, পাণ্ডু ঘুরিস কেনে, পারের সম্বল কেবল শ্রী চরণ তরী।।

৭০। ভাবিনির ভাবে মনা, কাণ্ডারী নাও বশ করে।।

ভাবিনির ভাবে মনা, কাণ্ডারী নাও বশ করে।। অনুরাগের চরায় তুলে জ্বরাতরি নাও সেরে।। সাঁই নামে গাউনি করে, গাব কালি দাও নিরে ক্ষীরে।। ছয় দাড়ি মাঝির কাজে, দাও গা মন যার যা সাজে, শ্রী রূপের বাদাম তুলে তরী ভাসাও সাগরে।। ভক্তি শিলারী মনরে, এটে ধর না তারে, দাঁড়াইবে মেঘের আড়ে, তম ঝড় যাবে দূরে।। হিংসা নিন্দা দেবংশে ধন, ক্ষমা ধৈর্যে ফেলবে যখন, পাণ্ডু বলে যারে তুফান, হিরুচাঁদ নিবেন পারে।।

বাউল
বাউল

৭১। গুরু যার মনে তবরূপ লেগেছে।।

গুরু যার মনে তবরূপ লেগেছে।। এইত ব্রহ্মাও মাঝে তার চক্ষুদানী হয়েছো।। পুত্র পিতা দ্বারা সুত, ভবের বন্ধু আছে যত, তুচ্ছ জ্ঞান করে, তীর্থ যাত্রা পর্যটন, গুরুর চরণে সব জেনেছে। গোবিন্দ হয় গৌরাঙ্গ চাঁদ, জগন্নাথ আর নিত্যানন্দ, গুরু সব জানে, নিষ্ঠারতি গুরুপদে, অন্যরূপ সে ছেড়েছে।। গৌর কি আর গাছে ধরে, গুরুরূপে গৌর ফেরে, এই সংসারে, গুরু সুখের সুখী হলে, ভব পারের ভয় কি তার আছে।। গুরু যার সদয় আছে, তার যম যাতনা দূরে গেছে, সাধু হয়েছে, হিরুচাঁদের চরণ ভুলে, পাঞ্জুর মানব জনম যায় নিছে।।

৭২। ভেবেছ দিন এমনি যাবে।

ভেবেছ দিন এমনি যাবে। দিনে দিনে দিন ফুরাল কয়দিন রবি ভবে।। ধন যৌবন জোয়ারের পানি, দেখতে দেখতে ভাটা হবে।। যৌবন ভাটা হলে কে সুধাবে তোরে, ভবের বন্ধু না চাহিবে ফিরে, পিতৃধন সব ফুরাইলে, শমনে ধরিবে।। যমন স্বপ্নে দেখি লক্ষ চাঁদের জ্যোতি, চেতন হয়ে পাইনে একটা বাতি, অস্তিম কালে এ যৌবনে, তমনি ফাঁকি দিবে।। করো দিন থাকিতে গুরুপদে মতি, অস্তিমে চরণ হবে সাথের সাথী, অধীন পাণ্ডু হল মৃঢ় মতি, কোন গুণে চরণ পাবে।।

৭৩। কে আছে মন সাথের সাথী।।

কে আছে মন সাথের সাথী।। ভেবে দেখ মন কয় দিন রবি ভবের পীরিতী।। ভব পারে হবে যাতি, কর গুরু পদে মতি।। পিছে পিছে ফিরছে যম রাজা, মিছে মায়ায় ভুলে করলি বড় মজা, যে দিন ধরবে শমন করবে সোজা, হবে কবেরেতে যাতি।। রাজার রাজ্যে এত সুখ ঐশ্বর্য, ভবের বন্ধু সব করিবে ত্যাজ্য, ভেবে দেখ মন সেই করবে, কিসে হবে গতি।। কে ভরাবে সে হিত বিপদে, দীন থাকিতে চেন দীননাথ, অধীন পাণ্ডু বলে গুরুর চরণ, রাখ হৃদয় গাঁথি।।

৭৪। তারে ধরব কি সাধনে।।

তারে ধরব কি সাধনে।। ব্রহ্মা আদি না পায় যারে যুগ যুগান্তর বসে ধ্যানে।। বেদ পুরাণে পাবে নারে নিরূপ নিরাকারে, নিরাকার জ্যোতি ময়ে আছে বসে নিত্য স্থানে।। অনাদির আদি মানুষ আছে সে গোপনে, সেই মানুষে সাধ্য করে রাধাকৃষ্ণ বৃন্দাবনে।। চিত্তামান ভূমি বৃক্ষ কল্পমহি বনে, গোপী কৃপা যার হয়েছে, সেই পেয়েছে রত্ন ধনে।। সখীরূপে যে দেখেছে গুরুর ধিয়ানে, পাণ্ডু বলে সেই রসিকে, দাসি হব শ্রীচরণে।।

৭৫। মন কেন তুই ভুলে রলি মউতেরই কথা।।

মন কেন তুই ভুলে রলি মউতেরই কথা।। তোর ব্যথার ব্যথীত কে আর আছে, কে ঘুচাবে ব্যথা।। আলি বড় সাধ করে এই ভবের বাজারে, লাভে মূলে সব হারালি আশা হল বৃথা।। মন তুই সম্বল হারায়ে, মিছে রলি ভুলে বীজকরেট ভেল্কী দেখে, বোধ এই মায়াজালে, কোনদিন ঘিরিবে কালে, হাকিমের যমন ঝাঁকের পাখীতে, ঝাঁকে ঝাঁকে বিলে পড়ে আহার করিতে, আহার করে সকল বড় আনন্দ করে, কারো কপাল গুণে মাহার খেতে, ফাঁদে বাঁধে মাথা।। তমনি এই ভবে এসে, অধীন পাণ্ডু খাচ্ছে আহার দলে মিশে, সদায় করি হায়রে হায়, ভবে রহিবে সবার, কোন দিন পাণ্ডু নাম মোর ভেঙ্গে নিবে, আগে জগৎ কৰ্তা।।

৭৬। ভেবে দেখ তলব হলে হুজুরেতে যাবি।।

ভেবে দেখ তলব হলে হুজুরেতে যাবি।। আশার আশে বিষয় করে, আর কত কাল খাবি।। ভবে আলি কি বলে, মালেকের হুজুরে, ভেবে দেখ মন সেই কথা কি জবাব দিবি।। মন এই ভব মাঝে, সুখের সময় সুখের বন্ধু সবায় মিলে, ও মন অস্তিম কালে, কি হবে কপালে, গুরু বিনে দুঃখের কথা, আর বা কারে বলবি।। মন সেই নিদান কালে, ডাকতে হবে সে দিন কেবল আল্লা বলে, আহা করবে সকলে, তোর চৌদিকে ঘিরে, ধরে নিবে কাল শমনে কার বা পানে চাবি।। মনরায় যাবে ছাড়ি, সাধের দেহ রবে পড়ি, কেবল ধুলায় পড়ি, সাঁই হিরুচাঁদে কয়, পাণ্ডু হল না তোর ভয়, দিন থাকিতে না ভজিলে কোন গুণে আর তরবি।।

৭৭। আগে মন গুরু করবে কাণ্ডারী।।

আগে মন গুরু করবে কাণ্ডারী।। পারঘাটায় তুফান মাঝে, চালাইবেন তরি।। আছে পঞ্চ জন দাড়ি, তাদের সহায় করি, যার যার দাড়ে তারে তারে, বসাও সারি সারি।। মাস্তুলে বাদাম দাও তুলি, সুবাতাসের ভাব জানি, উজান বাঁকে চালাও তরি, নামে গাও সারি, নদী বেগ ধরে ভারি, মন ভয় কি তোমারই, মাঝি ঐক্য হয়ে, রাখবে নোঙর করি।। যখন ভাটা যায় সারি, নদী দেখ নিহারী, নদী স্থলে মণি মুক্তা রহিবে পড়ি, মন আমার হয়ে ডুবারু, মণি মুক্তা নাও তুলি, দেখবি গুরু রূপের জ্যোতি উঠবে ঝলক মারি।। জ্বালায়ে রূপের বাতি, তরি বাও দিবা রাতি, বেয়ে সাধুর ভারা লও কিনারা ওমন বেপারী, অধীন পাণ্ডু কয় বাণী, শ্রীগুরু না চিনি, মিছে সাধুর ভারা ডুবাইয়ে খাবি খেয়ে মরি।।

৭৮। আমার অধম চাঁদ বিরাজ করে ভক্তের দ্বারে।।

আমার অধম চাঁদ বিরাজ করে ভক্তের দ্বারে।। ধনীর নয়নে মণির নয়নে, ভক্তির কাঙ্গাল সাঁই মোরে।। কুলবতীর কুলের গৌরব, রূপসীর গৌরব যৌবন, ধনির গৌরব ধন, কোন গৌরবে পাবে না তারে, ভক্তির জোরে পায় বিদুরে।। কেউ ধরব বলে হয় সন্ন্যাসী, বৈরাগী কেউ তীর্থবাসী, ব্রহ্ম হুতাসী, তারা জনম ভবে ঘুরে মরে, ভক্ত পায় মূলাধারে।। জোলার ছেলে ভক্ত কবীর, ঘরে বসে গুরু ধরে, সে চরণ ধরে, মুচিরামের স্বর্গে ঘণ্টা, পাণ্ডু মরে অহঙ্কারে।।

৭৯। আয় নাগরী অধর ধরি ভক্তি ডোরে।।

আয় নাগরী অধর ধরি ভক্তি ডোরে।। যারে যোগী ন্যাসী পায়না ধ্যানে, সে চাঁদ ফেরে ঘরে ঘরে।। ভক্তি জোরে নন্দরানী, খাওয়াইয়া ক্ষীর লনী, বেঁধেছে তারে, মাখন চোরা বলে মারে, তবু সে বিনয় করে।। ভক্তি ভাবে রাখাল গণে, খেলা করে বৃন্দাবনে, স্কন্ধে চড়ে তার এটো ফল দেয় সে বদনে, মিঠাবলে পান করে।। ভক্তিভাবে গোপীনিরে, বেঁধেছিল প্রেম ডোরে, সে ব্রজপুরে, প্রেমদারে গোপীর চরণ ধুলা, সে মাথায় করে।। সে চাঁদ উদয় নদে পুরী, অঙ্গে মাখা রাধা প্যারী, ফেরে নগরে, তারে রসিক জনা ধরে চিনে, পাঞ্জু চৌরাশী ঘুরে।।

৮০। মনরে দিনের কথা কর মনে।।

মনরে দিনের কথা কর মনে।। এদিন গেলে অন্তিম কালে, গতি নাই গুরু বিনে।। মনগুরু ভব পারের কর্তা, সত্য সত্য সাধু বার্তা, গুরু যিনি পরমাত্মা, ভজ বর্তমানে।। মন ভব পারে যাবি যদি, গুরুপদে কর মতি, যদি হয় মন নিষ্ঠা রতি, ভাবনা কি সেই দিনে।। মন যে সাধনে গুরুবর্ত, দিন থাকিতে জান অর্থ, অধীন পাণ্ডু অপদার্থ, ভজন সাধনে।।

বাউল
বাউল

 


৮১। মন আমার বৃথা গেল দিন রজনী।।

মন আমার বৃথা গেল দিন রজনী।। মিছে ভোজের বাজীতে ভুলে হারাই রতন মণি।। ছিলি অন্ধকারে মন, দিয়ে অমূল্য রতন, বড় যত্ন করে, ভবে তোরে পাঠায় কাদির গণি।। সাজায়ে এ সাধের তরি, বোঝাই দিয়ে নূর নীরি, পাঠায়ে ছিল মালেক তোরে মন বেপারী, না চিনে কাণ্ডারী, মিছে ঘুরে মরি, সে ধন ফুরাইল জ্বরা হল এ সাধের তরণী।। যে ধন ভবে বিকা’লি, তার মূল্য না নিলি, কি বলে জবাব দিবি মালেকের হুজুরী, মাল কার কাছে দিলি, তা’র কি সদায় নিলি, না বুঝিয়ে ঢেলে দিলি বালুচরে চিনি।। সাধের জনম হারালি, মন ফিরে না চা’লি, কোন দিন ভোজের বাজী ভেঙ্গে যাবে মন তোমারই, হেলায় এ দিন ফুরা’লি, সাঁই হিরু কর বাণী পাণ্ডু মনের ভুলে ঘুরে মলি, আশি লক্ষ যোনী।।

৮২। রূপে যে দিয়াছে নয়ন।।

রূপে যে দিয়াছে নয়ন।। জেনেছে ব্রহ্মাণ্ড মাঝে, গুরু রূপে নিরঞ্জন। জেনে শুনে সঁপেছে সে গুরুপদে দেহ ধন।। তার মন হয়েছে ফুলের জ্যোতি, মধুর লোভে গুরু করে, আত্মার সঙ্গে সম্মিলন।। তার হৃদয় শুরু রাজা, গুরু পূজা সর্বক্ষণ, পূজা করে প্রাপ্তি করে, নিত্য মধুর বৃন্দাবন।। নিত্য সেবায় বর্ত হয়ে, করছে প্রেম আস্বাদন, সে যোগ্য অযোগ্য হয়ে, অধীন পাণ্ডুর যায় যায় জীবন।।

৮৩। সুখের দিন গিয়াছে, গুরু বিনে আমার কে আছে।।

 সুখের দিন গিয়াছে, গুরু বিনে আমার কে আছে।। এ ভবের যত খেলা, হল সব মিছে।। যৌবনের গুমার ছিল, দেখতে দেখতে ভাটা হলো, কোন দিন ধরবে কাল শমনরে, মন দাঁড়াবি কার কাছে, গুরু বিনে বন্ধু নাই সাধু হলেছে।। চুল পাক্‌লো দন্ত পোলো, বুদ্ধি বল হত হোলো, কি করতে ভবে এসে মন, কি করলি পাছে, আমার পাছের কথা ভুলে রয়েছে।। গুরু দেয় উপাসনা, দিন থাকতে মন রসনা, না করে সে ভজনারে, যাবি নরক বিছে, না ভজে পাণ্ডুর জনম বৃথা হয়েছে।।

৮৪। কোন গুণেতে ধরব শুরু মনের বিকার সারে না।।

কোন গুণেতে ধরব শুরু মনের বিকার সারে না।। মহা মায়ার ঘোরে প’ড়ে আমার স্বভাব ফিরে না।। জানি কোন অপরাধে, ভুলে এই মায়ামদে, অপারের কাণ্ডারী গুরুপদে নয়ন থাকে না।। শুরুর মন না জেনে ভজন করতে চায়, শিশু হয়ে চাঁদ ধরা তার হয়, সদা করে সে আয় আয় চাঁদ অমনি সরে যায়, তমন অবলা শিশুর মত গুরুর চরণ চেয়ো না।। ধরার ভাবনা জেনে যোগী হয়েছি, সাধু জনে বলবে রে ছি ছি, এই দেহে থেকে, জ্ঞান হলো না দেখে, সাধুজনে শুরু পাব বলে কুলমান রাখে না।। যে প্রেমেতে গুরু ধরা যায়, সামান্যে কি সে প্রেম জানা যায়, সাধু কৃপা হয়, পাণ্ডু বলে গোপী কৃপার শুরু ফেলে যাবে না।।

৮৫। দেখ স্বরূপ নেহারে।।

দেখ স্বরূপ নেহারে।। যদি দয়া করে মন তোমারে চক্ষুদানী শুরু করে।। দ্বিদলেতে সিংহাসনে, কিবা শোভা করে, কোটি চন্দ্র জিনি কিরণ, অক্ষয় চাঁদের উপরে।। সখিগণ সঙ্গে লয়ে অটল বিহরে, তিল প্রমাণ জায়গায় বসে, আছে মানুষ সভা করে। চর্ম চোখে হবেনারে, গুরু কৃপা বিনে, অধীন পাণ্ডু কেঁদে বলে, খেলছে মানুষ নীরে ক্ষীরে।।

৮৬। মুরশিদ চাঁদ কি ধরা যায় রে।।

মুরশিদ চাঁদ কি ধরা যায় রে।। আগে জেন্দা মরা নাহি মরে।। মরার সঙ্গে সঙ্গ ধরে, মরতে হয় স্বরূপ দ্বারে।। দু’ঞ্জন মরা জেন্দা মরারে সদায় মরে বাঁচে, দু’জন মরার মূল রয়েছে অধর মানুষের কাছে, মরা ধরে সন্ধি করে, থাক মরার ভাবে মরে।। এমন মরা কে দেখেছে রে, আপনি মরে আছে, যমে এসে যখন ধরে তখন মরা বাঁচে, তারা যমের সঙ্গে যুদ্ধ করে, দু’জনা যায় দু’দিক সরে।। মরা ধরে ভজন সাধন রে কর অনুরাগে, রাগে বাগে মরার কাঁদে, ধর মুরশিদ চাঁদে, অধীন পাণ্ডু বলে অবহেলে, পারে যাবে চরণ ধরে।।

৮৭। মরার ভাব লয়ে মন না মরিলে।।

মরার ভাব লয়ে মন না মরিলে।। দয়া করবে কেন মরণ কারে।। দু’জন মরা সুজন তারারে থাকে মানুষের কাছে, জীবেরে ডুবায়ে মারে মায়া নদীর মাঝে, যে ডুবায় সে তুলতে পারে, তারই সঙ্গে প্রেম করিরে।। মরার প্রেমে মত্ত হলেরে, সহজ মানুষ মিলে, সহজ রূপে নয়ন দিয়ে, রসের খেলা খেলে, সে নিত্য প্রেমে বর্ত হবেরে, কি করবে তার যমদূত কালে।। যে মরেছে এমন মরারে, তার কিসের অভাব আছে, ভবের খেলা মরার জ্বালা সকল জানে মিছে, সাঁই হিরু চাঁদের চরণ ভুলে, পাণ্ডুর জনম যায় বিফলে।।

৮৮। আছে যার গলায় গাথারে, ও জাড়ের কাঁথা।।

আছে যার গলায় গাথারে, ও জাড়ের কাঁথা।। মন সূঁচে ধ্যান কাপড়ে নামের সুতা।। অনুরাগ হৃদয় জ্বেলে, কাঁথা লয় গলায় তুলে, মহামায়ার শীত এড়ায়ে, প্রেমে মাতা।। কাঁথা গলায় করে, ভাবে মজে কৌপীন পরে, শ্রীরূপের দ্বারে যায়, ভিক্ষা মেঙ্গে খায়, ভবের ক্ষুধা মেরে কয় সে গুরু কথা।। চিন্তামণির ভাবে, চিন্তা কাঁথার বেহার পরে, থাকে চাতক হয়ে, রূপে নয়ন দিয়ে, গুরু সুখের সুখী হয়ে, মুড়ায় মাথা চরণ দাসী হয়ে, বেড়ায় ভাবের কাঁথা লয়ে, সাঁই হিরুচাঁদে কয়, ভেজন নাই আমার কোন গুণে হিরু চাঁদ মোর ভাব জানাবে।। হয়ে দয়াময়, পাণ্ডু তুই ধরে থাকরে প্রেমের লতা।।

৮৯। ভজন সাধন করবি রে মন কোন রাগে।।

ভজন সাধন করবি রে মন কোন রাগে।। আগে মেয়ের অনুগত হগে।। জগৎ জোড়া মেয়ের বেড়ারে, কেবল এক পতি সাঁইজি জাগে।। মেয়ে সামান্য ধন নয়, জগৎ করছে আলোময়, কোটি চন্দ্র জিনি কিরণ, বুঝি আছে মেয়ের পায়, মেয়ে ছাড়া ভজন করারে, তা হবে না কোন যোগে।। যদি রূপার টাকা পায়, জীব কপালে ছোঁয়ায়, রজত কাঞ্চন স্বর্ণ রূপা, পতি দিচ্ছে মেয়ের পায়, এমনি ধনি চিনিরে, জীব পড়বেরে পাপের ভোগে।। মেয়ে নারে মারলে গুরুমারা আহ্লাদিনী রেখেছেন চৈতন্য গোসাঁই, দরশনে দুঃখ হরে রে, তার চরণে নিগে।। বলে হিরু চাঁদ আমার, মনোহর, আকর্ষণে জগৎ পতি দিল রাধার দাস স্বীকার, তুই ধরবি যদি চরণ, মেয়ের চরণ আগে।।

৯০। যে মানুষের মন হরে।।

যে মানুষের মন হরে।। সে রয়েছে ঘিরে।। যে হরে প্রাণ হরে রে, পরকাল দিতেও পারে।। দেখে চমৎকার, চার অবতার, আসামীর কাছে মহাজনে হচ্ছে তাবেদার, বাপ বেটায় পুরুষরে, যার বেঁধেছে মোহরে।। বুঝার সাধ্য আমার, ভবে এ কেমন বিচার, যুগের মা বারার চাতকের প্রকার, পুরুষ মণি পরশ ধনীরে, তবু দেন বাবারে।। জানি কি ধন আছে তার, কিসে দেনাদার, না বুঝিয়ে বুঝি আশির ফের, মন উদ্ধার হবি ঘুচাবিরে, আগে মহাজনেরে।। এই সাগরে, মহাজনের ধন মেরে, দারমালি আসামী হলাম, আমায় কেবা উদ্ধারে, মুরশিদ হিরু চাঁদে জেন্দা মরে রে, থাকলে ঐ ধরে।।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন